আব্দুল জলিল
জুন ৭, ২০২২
৭:৩৭ পূর্বাহ্ণ
পাথরের জট খুলছে

পাথরের জট খুলছে

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের গঠিত কমিটির ১৩টি সুপারিশ, পাথর কোয়ারির তালিকা হালনাগাদের সিদ্ধান্ত, পাথর উত্তোলন বন্ধে চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে

সিলেট জেলার কানাইঘাট উপজেলার লোভা নদীর দু’পাড়ে জব্দ প্রায় ১ কোটি ঘনফুট পাথর আদালতের রায়ে কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকলে তা নিলামে বিক্রি করতে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সিলেট জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। আদালতের আদেশ মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে হবে। পাথর কোয়ারি, পাথর উত্তোলন, খাস আদায় এবং জব্দ পাথর উন্মুক্ত নিলামের বিষয়ে দায়ের করা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাঝে পাথর প্রধান কাঁচামাল বিবেচনায়, পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দিলে দেশের চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সিদ্ধান্ত রংপুর বিভাগের পঞ্চগড়, লালমনিরহাট জেলা এবং সিলেট বিভাগের সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলা ডিসিকে গত ২ জুন চিঠি দেওয়া হয়েছে।

গত ৩১ মে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ পাথর উত্তোলনের ফলে সৃষ্ট সমস্যা নিরসনে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সভায় কার্যপত্রে বলা হয়, পাথর উত্তোলনের ফলে সৃষ্ট বিরূপ প্রভাব ও উত্তোলন বন্ধের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা বিষয়ে সুপারিশ প্রদানের জন্য ২০১৯ সালের ৩ ডিসেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সমন্বয় ও সংস্কার সচিবের নেতৃত্বে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়। পরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সমন্বয় ও সংস্কার সচিবের নেতৃত্বে একটি উপ-কমিটি ২০২০ সালের ২৯ ও ৩০ আগস্ট সিলেট জেলার পাথর কোয়ারিগুলো পরিদর্শন করেন।

পরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (জেলা ও মাঠ প্রশাসন) গঠিত অপর একটি উপ-কমিটি ২০২১ সালের ৭ ও ৮ জানুয়ারি রংপুর বিভাগের পঞ্চগড় এবং লালমনিরহাট জেলার পাথর কোয়ারিগুলো পরিদর্শন করেন। গত বছর ১৫ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সমন্বয় ও সংস্কার সচিবের নেতৃত্বে গঠিত কমিটি ১৩টি সুপারিশসহ বিস্তারিত একটি প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের কাছে জমা দেন। এ দুই কমিটির প্রতিবেদন নিয়ে গত ৩১ মে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের সভাপতিত্বে পাথর উত্তোলনের ফলে সৃষ্ট সমস্যা নিরসনে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভার সিদ্ধান্ত সিলেট ও লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, ভূমি মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য, নৌ-পরিবহন, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো এবং বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, পরিবেশগত ক্ষতি, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাহিদা ও জোগান, আমদানি সম্ভাব্যতা এবং আর্থিক বিষয়গুলো বিবেচনায় কৃষি জমি এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ করতে হবে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে বিদ্যমান গেজেটভুক্ত পাথর কোয়ারিগুলো পুনরায় ইজারা প্রদান করা যাবে কি না তা যাচাই করার লক্ষে জিওগ্রাফিক্যাল সার্ভে এবং সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হলো। এ কমিটিতে ভূমি মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য, বেসাময়িক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, নৌ-পরিবহন, পানি সম্পদ মন্ত্রণায়, পরিবেশ অধিদফতর, বিভাগীয় কমিশনার, রংপুর, সিলেট এবং সিলেট এবং খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো এবং বাংলাদেশ তাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরের প্রতিনিধি সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে।

গঠিত এ কমিটি গেজেটভুক্ত পাথর কোয়ারিগুলোর মজুদ পাথরের পরিমাণ, উত্তোলনযোগ্য পাথরের পরিমাণ, উত্তোলনের সময়কাল, পাথর কোয়ারির এলাকার পরিবেশ, নদীর নাব্যতা সঙ্কট বিবেচনায় মানব স্বাস্থ্য, কৃষি, ইকো-সিস্টেম, মৎস্য ও জীব-বৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশ বিবেচনা করে পাথর কোয়ারির তালিকা হালনাগাদ করবে। এই কমিটিতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠান হিসেবে আরো সদস্য কো-অপ্ট করতে পারবে। তা আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যস্থা গ্রহণ করবে।

এছাড়া পাথর ভাঙার জন্য সিলেট জেলার কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার ভোলাগঞ্জ, গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং এবং সুনামগঞ্জ জেলার তাহেরপুর উপজেলায় একটি এবং রংপুর বিভাগের পঞ্চগড় জেলার বাংলাবান্ধা ও লালমনিরহাট জেলার বুড়িমারি এলাকায় দুইটি ক্রাশার জোন শিল্প মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে স্থাপনের উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে স্টোন ক্রাশিং মেশিন স্থাপন নীতিমালা ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৩) এর প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সংশোধন আনা যেতে পারে বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পাথর কোয়ারির সাথে সম্পৃক্ত মহিলা শ্রমিকদের মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের আয়বর্ধক প্রকল্পের মাধ্যমে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শ্রম আইন ২০১৬-এর আওতায় পাথর শ্রমিকদের জন্য নতুন বিধিমালা এবং নীতিমালা প্রণয়নের জন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।

পরিবেশ অধিদফতর প্রচলিত বিধিবিধানের আলোকে পাথর কোয়ারি জন্য পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা ইআইএ-এর একটি জেনেরিক টিওআর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইডে দিতে পারবে এবং ইআইএ সম্পাদন সংক্রান্ত আবেদনটি অতিদ্রুত নিষ্পত্তি করতে বলা হয়েছে।

এদিকে সিলেটের একাধিক পাথর কোয়ারি থেকে পাথর আহরণ, উত্তোলন বন্ধ করতে বছরখানেক আগে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় নির্দেশ দেয়। সেই নির্দেশের আলোকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় পাথর উত্তোলন। যদিও ২০১৮ সাল থেকে বিভিন্ন কোয়ারি থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে রয়েছে। পাশাপাশি ২০১৪ সালে উচ্চ আদালত সিলেটের সব পাথর কোয়ারিতে যন্ত্রের ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। পাথর কোয়ারিতে অচলাবস্থার মধ্যে সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ের সেই আদেশ ৬ মাসের জন্য স্থগিত ও সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনসহ বিভিন্ন বিষয়ে নির্দেশনা দেন উচ্চ আদালত। এ অবস্থায় আশায় বুক বাঁধেন লাখ লাখ পাথর ব্যবসায়ী ও শ্রমিক। তারা আশা করছিলেন, উচ্চ আদালতের আদেশ ও নির্দেশনায় দীর্ঘদিন পর হলেও করোনার প্রভাব মোকাবিলায় মানুষের আয়-রোজগারের পথ সুগম হবে। কিন্তু তাদের সেই আশার প্রতিফলন সহসাই হচ্ছে না। উচ্চ আদালতের সেই আদেশ-নির্দেশনা স্থগিত করেন আপিল বিভাগ। সরকারের পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করলে তা স্থগিত করা হয়। ফলে আবার দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে পাথর কোয়ারি চালু প্রক্রিয়া। যদিও রিট আবেদনকারীরা সুপ্রিম কোর্টে আবার আপিল করেছেন।

গত বছর ২ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সহকারী সচিব মাতোয়ারা বেগম স্বাক্ষরিত একটি চিঠি যায় সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কাছে। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে ওই চিঠিতে ৬ দফা সুপারিশ করা হয়। এতে কোয়ারি ইজারা দেওয়া যেতে পারে বলে মতামত দেওয়া হয়েছে। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ পাথর উত্তোলনে অনুমতি দেওয়া হলে উত্তোলনের ফলে তৈরি হওয়া গর্তগুলো ভরাট করা, ইতোপূর্বে পাথর উত্তোলনের ফলে সৃষ্ট গর্ত ভরাট ও বনায়ন করা, হাজার হাজার পাথর শ্রমিকের বিকল্প কর্মসংস্থান হিসেবে শিল্প-কারখানা স্থাপন ও পর্যটন শিল্পের বিকাশ, জাফলং ও ভোলাগঞ্জে সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া ও নিয়মিত টাস্কফোর্সের অভিযান অব্যাহত রাখা।

সিলেট জেলা প্রশাসক জানান, সুপারিশের বিষয়টি তিনি অবগত হয়েছেন। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে তা স্থগিত করা হয়। ইজারা সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা এখনো তিনি পাননি। বছরের পর বছর ধরে সিলেটের বিভিন্ন পাথর কোয়ারি বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ী ও সমিতি উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন। ভোলাগঞ্জ কোয়ারি চালুর দাবিতে রিট করেন ব্যবসায়ী আব্দুল আজিজ। একইভাবে জাফলং কোয়ারির জন্য জাফলং বল্লাঘাট পাথর উত্তোলন ও সরবরাহ বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম ও বিছনাকান্দি কোয়ারির জন্য ব্যবসায়ী সমিতির রমজান আলী রিট আবেদন করেন।
ইনকিলাব

শেয়ার করুন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *