নভেম্বর ২৮, ২০২০
১:৪৯ অপরাহ্ণ

পাড়া-মহল্লার কিশোর গ্যাং ও ‘বড় ভাইদের’ তালিকা হচ্ছে

খবর ডেক্সঃ- তিন স্তরের অপরাধ চক্রের সদস্যদের ডাটাবেজ তৈরি করতে মাঠে নেমেছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ। চলতি সপ্তাহ থেকে তাদের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হচ্ছে বলে এসএমপি সূত্র জানিয়েছে।

শুধু কিশোর অপরাধীদের তালিকা নয়, এ তালিকায় থাকছে কিশোর অপরাধীদের মদদদাতা ‘বড় ভাইদের’ নাম। এ লক্ষ্যে একাধিক সংস্থা কাজ করছে। কিশোররা বেপরোয়া হয়ে ওঠার পেছনে কারা এবং কাদের শেল্টার রয়েছে এসব তথ্য আইনশৃঙ্খরা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে রয়েছে। তৈরির পরই অভিযানে নামবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসএমপি’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানিয়েছেন।

এদিকে, নতুন ডাটাবেজে কিশোর অপরাধীদের তালিকায় তাদের অভিভাবকদের নাম-ঠিকানা, ন্যাশনাল আইডি কার্ড ও টেলিফোন নম্বর এবং তাদের কর্মস্থলের বিবরণ লিপিবদ্ধ রাখা হবে। যাতে যে কোনো প্রয়োজনে তাদের মাধ্যমে এসব অপরাধীর অবস্থান দ্রুত নিশ্চিত হওয়া যায়।

পুলিশের এসপি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা জানান, কিশোর অপরাধীদের নামের তালিকা তৈরি করে তাদের কারাগারে পাঠানো মূল উদ্দেশ্য নয়, বরং তাদের সংশোধন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনাই এর মূল টার্গেট। তাই তালিকাভুক্তির পাশাপাশি সন্তানদের ব্যাপারে অভিভাবকদের সচেতন করাসহ বেশকিছু ভিন্নমুখী কার্যক্রমও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বিশেষ করে শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের মাদকের ভয়াল থাবা এবং অপরাজনীতি থেকে দূরে রাখার ব্যাপারে বিশেষ তাগিদ থাকবে।

গোয়েন্দা বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, স্বল্পসংখ্যক কিশোর গ্যাং সাইবার ক্রাইমের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও ভিন্ন কোনো অপরাধের সঙ্গে তারা জড়িত নয়। তবে বিপুল সংখ্যক কিশোর গ্রুপ ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ইভটিজিংয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে নিয়মিত হাত পাকাচ্ছে। এরই মধ্যে তাদের কয়েকটি গ্রুপকে গোয়েন্দারা চিহ্নিত করেছে। এসব গ্রুপের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা অন্তত দুই ডজন গডফাদারের তথ্যও গোয়েন্দাদের হস্তগত হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

কিশোর গ্যাং স্টারদের তালিকা না থাকায় তারা একের পর এক অপরাধ করে নির্বিঘ্নে পার পেয়ে যাচ্ছে। আবার কখনো এ চক্রের দু’চারজন গ্রেফতার হলেও তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা গডফাদাররা স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে কিংবা রাজনৈতিক দাপট দেখিয়ে তাদের অনায়াসেই ছাড়িয়ে নিচ্ছেন। এ সময় তারা অভিযুক্ত অপরাধীদের কাউকে দলীয় কর্মী, আবার কাউকে মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে জাহির করছেন। পুলিশের হাতে তাদের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য না থাকায় স্থানীয় চাপে অনেক সময় তাদের তা মেনে নিতে হচ্ছে। এতে চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ত ও ইন্ধনদাতারা অধরাই থেকে যাচ্ছে।

সুত্র মতে, নগরী বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে জায়গা দখল, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকান্ড চালানো হচ্ছে। কারা চালাচ্ছে আর কারা তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন সকল তথ্য নিয়েই তালিকা তৈরী হচ্ছে। তিন স্তরের এ তালিকায় অপরাধীদের গডফাদারকেও ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে এসএমপি’র ৬ থানার ওসিকে কিশোর অপরাধ ও তাদের মদদদাতাদের তালিকা তৈরি করতে নির্দেশনা দিয়েছেন পুলিশ কমিশনার। বিভিন্ন থানা এলাকায় কারা কিশোর গ্যাং কালচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, কিশোরদের মধ্যে কারা বিভিন্ন মাদক বিক্রি, মাদক পাচার, চাঁদাবাজি, ইভটিজিং ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত তাদের তালিকা করতে বলা হয়েছে।

নগরীর পাড়ায় পাড়ায় চলছে কিশোর অপরাধীদের দাপট। খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ফুটপাত বাণিজ্য, চুরি, দাঙ্গা-হাঙ্গামাসহ প্রায় সব ধরনের অপরাধেই জড়িয়ে পড়ছে তারা। তাদের নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব অপরাধীর অনেকে মাদকাসক্ত। অস্ত্র ও মাদক ব্যবসাতেও আছে তাদের পদচারণা। নগরীতে গেল পাঁচ বছরে সংঘটিত বেশ কয়েকটি খুন, ছিনতাই, চুরি ও অপহরণ ঘটনায় যারা আটক হয়েছে তাদের বেশির ভাগই উঠতি বয়সী। অস্ত্র, ইয়াবাসহ ধরা পড়ছে কিশোর ও যুবকরা।

পুলিশের তথ্য মতে, কিছু কিছু এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত। মেয়েদের ভ্যানিটি ব্যাগ ও মোবাইল ছিনতাইয়ের অধিকাংশ ঘটনায় কিশোর অপরাধীরা জড়িত। নিজ এলাকার মধ্যেই এরা নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে কিশোর সন্ত্রাসীদের অধিকাংশই অপরিচিত মুখ। যে কারণে গ্রেফতার কিংবা আটকে সফল হচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নগরীর ছিনতাইয়ের কবলে পড়েছেন এমন কয়েক ব্যক্তির সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, যারা তাদের টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নিয়েছে তাদের বেশির ভাগের বয়স ১৪ থেকে ২০ বছরের মধ্যে

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার নিশারুল আরিফ ‘জালালাবাদ’কে বলেন, অপরাধী হয়ে কেউ জন্মায়না। শিশুদের দু’টি শিক্ষা রয়েছে। একটি প্রাথমিক শিক্ষা ও অপরটি পারিবারিক শিক্ষা। শুরুতে পরিবার থেকেই শিশুকে শিক্ষা নিতে হবে। এখান থেকে সুশিক্ষা পেলে তার নৈতিক অবক্ষয় হবে না। পুলিশ জনগণের সহায়তা নিয়ে কাজ করে। অপরাধ দমনে ভয় না পেয়ে সব নাগরিকের উচিত পুলিশকে সহায়তা করা। এ ক্ষেত্রে তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রাখা হবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে অপরাধের তিন স্থরের যে তালিকা তৈরি হচ্ছে এরমধ্যে রয়েছ, কিশোর গ্যাং, ইভটিজার ও চাঁদাবাজ। মহল্লাভিত্তিক এ তালিকা সম্পন্ন হওয়ার পরই আইনিভাবে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

শেয়ার করুন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *