আগস্ট ১২, ২০২০
৮:৩১ অপরাহ্ণ

মুজিব মানে লাল সবুজের রক্তিম পতাকা

কবির মাহমুদ
উপ-সম্পাদকীয়

১৫-ই আগস্ট বাংলাদেশর জাতীয় শোক দিবস। রাষ্ট্রীয়ভাবে এ দিবসটি শোকের সাথে পালন করা হয়। এ দিবসে কালো পতাকা উত্তোলন ও বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা অর্ধনিমিত রাখা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এই দিনে বাংলাদেশ ও স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে এ দিবসটি প্রতি বছর পালিত হয় দুয়া, মিলাদ ও বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে।

১৯৭১-এ পরাধীনতার শিকল থেকে মুক্তি দিতে, শেখ মুজিবের রেসকোর্স ময়দানে সাত কোটির মানুষের উদ্দেশ্যে লক্ষ জনতার সামনে ০৭-ই মার্চের সেই বিদ্রোহী বজ্র ভাষণ বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। শত্রুর বুকে বারুদের আগুন দাউদাউ করে জ্বলছিল। সাত কোটি বাঙালি উদ্বুদ্ধ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্বাধীনতার বর্ণলালে। দীর্ঘ নয় মাস প্রাণক্ষয়ী যুদ্ধে তিরিশ লক্ষ প্রাণের রক্ত নাড়িয়ে রক্তিম সূর্যের ঊষার আলোতে বিশ্ব ইতিহাসে নাম লেখালো লাল সবুজের স্বাধীন বাংলাদেশ। যার অক্লান্ত পরিশ্রম ধ্যান ধারনা কলা কৌশল আর সাহসী বিদ্রোহী ভাষণের প্রেরণায় মনে বল আর বাহুর শক্তিতে পেয়েছি একটি স্বাধীন সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্র। পেয়েছি লাল সবুজের রক্তিম পতাকা, ৫৬ হাজার বর্গমাইলের একটি মানচিত্র। পেয়েছি বিশ্ব দরবারে গর্বের সহিত মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার ঠাঁই। কিন্তু মির-জাফরের মতো তাকেই আমরা ভুলে গিয়ে স্বাধীনতার চার বছরের মাথায় বাংলার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় রচনা করে হৃদয় বিদারক ঘটনার জন্ম দিয়ে রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে চিরদিনের মতো বিদায় জানালাম সপরিবারে। সত্যি আমরা এক অকৃতজ্ঞ মহা-জাতি।

১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এ বাংলাদেশের ইতিহাসে কালো অধ্যায়ের রচনা করে, মধ্য সারির সশস্ত্র অফিসারদের সংগঠিত একটি সামরিক অভ্যুত্থান। খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে শেখ মুজিবুর রহমানসহ পরিবারের ১৬ সদস্যের সতেজ প্রাণ, সেদিন রক্তে রঞ্জিত নিতর করে ঝাঝরা করেছিল গোটা বাংলাকে সেই নর পরশু দল।

রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের বাসায়
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট গভীর রাতের কালো অধ্যায় অভিযানের নেতৃত্ব দেন মেজর একেএম মহিউদ্দিন আহমেদ। মেজর বজলুল হুদা রাষ্ট্রপতির বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণকারী প্রথম ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্টের অ্যাডজুট্যান্ট থাকায় তাকেও দলে রাখা হয়। সেই দলে মেজর এসএইচএমবি নূর চৌধুরীও ছিলেন। রক্ষীদের দায়িত্বে থাকা ক্যাপ্টেন আবুল বাশার মেজর ডালিমের অধীনে দায়িত্ব পালন করেন। বিদ্রোহীরা জোর করে বাসভবনে প্রবেশের চেষ্টা কালে বাসভবন রক্ষা করতে যেয়ে কিছু রক্ষীবাহিনী সেদিন নিহত হয়েছিল। তাদের প্রাণের বিনিময়ও শেষ রক্ষা হয়নি শেখ মুজিবের।

শেখ কামাল নিবাসকে রক্ষা করতে গিয়ে আহত হয়েছিলেন, আক্রমণকারীরা। কমপ্লেক্সে প্রবেশের পর ক্যাপ্টেন হুদা শেখ কামালকে হত্যা করেছিলেন। শেখ মুজিব বিদ্রোহীদের কাছে অসহায় হয়ে করুন সুরে জিজ্ঞেস করছিলেন “আপনারা কী চান? প্রতিউত্তরে কিছু না বলেই শেখ মুজিবকে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় মেজর নূর ও ক্যাপ্টেন হুদা তাঁকে গুলি করেন। শেখ মুজিবের ছেলে শেখ জামাল, জামালের স্ত্রী রোজী, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, শেখ মুজিবের স্ত্রী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছাকে প্রথম তলায় বাথরুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মেজর আবদুল আজিজ পাশা ও রিসালদার মোসলেমুদ্দিন তাদের সবাইকে বাথরুমের ভেতরে গুলি করে হত্যা করে। তার কর্মের কৃতিত্ব হিসেবে মেজর ফারুক ঘটনাস্থলে ক্যাপ্টেন হুদাকে মেজর এবং সুবেদার মেজর আবদুল ওহাব জোয়ারদারকে লেফটেন্যান্ট পদে পদোন্নতি দেন। এ যেনো এক সিনেমার কাল্পনিক গল্প! না! সিনেমার কাল্পনিক গল্পও সেদিন হার মেনেছে! এমন গল্পই রচনা করেছে বাংলার ইতিহাসে ওই পাষাণের দল।

গভীর রাতে ফারুক এসে পৌঁছে যান একটি ট্যাঙ্কে। শেখ মুজিবের ডাক পেয়ে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমদ বঙ্গবন্ধুর আবাসে যাওয়ার পথে গুলিতে নিহত হন। রক্ষীবাহিনী একটি সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের পর আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় এবং তাঁদের বাড়ির বাইরে সারিবদ্ধ করা হয়। মেজর নূর অভ্যর্থনা এলাকার বাথরুমে শেখ মুজিবের ভাই শেখ নাসেরকে গুলি করে হত্যা করে।
নিষ্পাপ নিরপরাধ ছোট্ট শিশু শেখ রাসেল বাঁচতে চেয়েছিল এই সুন্দর স্বাধীন বাংলার মাটিতে। প্রাণ ভরে নিশ্বাস নিতে চেয়েছিল এই সবুজ সমারোহে। বাবার আহবানে এই স্বাধীন মাটিতে স্বপ্নের বীজ বুনতে চেয়েছিল। কিন্তু মেজর পাশা একজন হাবিলদারকে নির্দেশ দেন, মায়ের নিতর দেহের কাছে কাঁদতে থাকা সেই ছোট্ট শিশু শেখ রাসেলকেও হত্যা করার। বাঁচার আকুতি নিয়ে শেখ রাসেল দৌঁড়ে পালাতে গিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি তাঁর। নিষ্পাপ শেখ রাসেলও আগস্টের কালো ছুবলে রক্তাক্ত দেহতে মা বাবার সঙ্গী হয়ে বিদায় জানাতে হয় এই কলুষিত বাংলার মাটিকে। হয়তো সেদিন নিষ্পাপ ছোট্ট রাসেল চিৎকার দিয়ে বাবাকে বলেছে- এই দেশ, মাটি আর মানুষের জন্যই তো তোমার জীবন বিলিন করে দিয়েছিলে। আজ দেখো না বাবা! এই জাতি তোমাকে কি চমৎকার উপহার দিয়েছে। বেদনার সুরে এসব বলে বলে জীবনের শেষ নিশ্বাস হয়তো ত্যাগ করেছে!

সেদিন ভাগ্যক্রমে আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে ছিলেন বলে আজও বেঁচে আছেন! সব মিলিয়ে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট শোকের কালো ছায়া গোটা জাতিকে নিস্তব্ধ করে দিয়েছিল। মানুষের কান্নার অধিকারটুকুও বোবা হয়ে গিয়েছিল। আকাশ বাতাস কেঁদে উঠেছিল নিরবে। জিম্মি করেছিল পুরো জাতিকে। আমরা সেদিন কাঁদতেও পারিনি! শুধু, শেখ মুজিব কিংবা শেখ মুজিবের পরিবারকে হারাইনি, হারিয়েছি বাঙালি জাতির পিতাকে, হারিয়েছি বাংলার বীর সন্তানকে, হারিয়েছি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালিকে। হারিয়েছি চিরসবুজ বাংলার আগামী পথচলাকে। কিন্তু ওরা ভুলে গিয়েছিল শেখ মুজিবের মৃত্যু যে কোনোদিন হবে না। শেখ মুজিব বেঁচে আছেন
মানুষের হৃদয়ে। শেখ মুজিব শুধু একটি নাম নয়! শেখ মুজিব এক বিদ্রোহের নাম, শেখ মুজিব এক বিপ্লবের নাম, শেখ মুজিব একটি জাতির নাম। শেখ মুজিব মানে লাল সবুজের রক্তিম পতাকা, শেখ মুজিব মানে একটি মানচিত্র।

শেখ মুজিব আজও বেঁচে আছেন এই বাংলার আকাশে। বেঁচে থাকবেন ৭ই মার্চের ১৮ মিনিটের বজ্র ভাষণে, ২৬ শে মার্চের স্বাধীনতা ঘোষকে, ১৫ই আগস্টের রক্তাক্ত দেহতে, কিংবা ১৬ই ডিসেম্বরের জাতীয় দিবসে। এ দেশের আকাশ বাতাস, নদী সমুদ্রে বৃক্ষলতায় মিশে আছে সেই চিরচেনা শেখ মুজিবের নাম। পুব আকাশের ঊষার রবিতে, জোছনা রাতে চাঁদের আলোতে, দোয়েলের শীষে, কাঁঠালের ঘ্রাণে, শাপলার পাপড়িতে, সবুজের বনে, রক্তিম লাল সবুজের পতাকায় অনন্তকাল দোলা দিয়ে যাবে শেখ মুজিবের সেই বিদ্রোহী সংগ্রাম।

লেখক: সাহিত্য সম্পাদক, আজকের খবর

শেয়ার করুন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *