ডিসেম্বর ১২, ২০২০
৭:৩২ পূর্বাহ্ণ

হয়রানির সহজ ‘অস্ত্র’ ক্ষুদ্রাকৃতির ‘ইয়াবা’জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা

খবর ডেক্সঃ- রক্ষক যখন ভক্ষক, তখন জনগণ অসহায়। পুলিশের কাছে সাধারণ জনগণের এই অসহায়ত্ব এখন অনেকটাই ওপেন সিক্রেট। মাদক দিয়ে নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা যেনো এখন নিত্যদিনের চিত্র। হয়রাণির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ক্ষুদ্রাকৃতির ট্যাবলেট ‘ইয়াবা’। পুলিশের কতিপয় সদস্য ইয়াবা সেবন ও ব্যবসায় জড়িয়ে নিরীহ লোকজনকে নানা হয়রাণি করছে। আবার প্রতিপক্ষকে হয়রাণি করতে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসাতে অনেকে পুলিশকে ব্যবহার করছে। ক্ষেত্র বিশেষে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও প্রশ্ন থেকে যায় তদন্তের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে। এ অভিযোগ নগর থেকে গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি সিলেটে মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-৯। এ সময় তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমান ইয়াবা ট্যাবলেটও জব্দ করে। জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলেও থেমে নেই এই অসাধু চক্র।

একাধিক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য মতে, গত ২৭ জানুয়ারী রাতে নগরের দাঁড়িয়াপাড়ায় শিশুদের জোরপূর্বক ইয়াবা সেবনের মাধ্যমে তাদের পতিতাবৃত্তি ও ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত থাকার অপরাধে ৭ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো.রোকন উদ্দিন ভূইয়া ও তার কথিত স্ত্রী রিমা বেগমকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৯। এ সময় তাদের হেফাজতে থাকা দুই শিশুকে উদ্ধারের পাশাপাশি ৬০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় মানবপাচার ও মাদক আইনে র‌্যাব বাদী হয়ে দুটি মামলা দায়ের করে।

এছাড়া নগরীর আম্বরখানায় একটি রেস্তোরাঁয় অভিযান চালিয়ে ইয়াবাসহ পুলিশ কনস্টেবল তোফায়েল আহমেদ ও তার সহযোগিকে আটক করে র‌্যাব-৯। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে ৭৪৩ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এছাড়াও সিলেট পুলিশের ১ জন এবং র‌্যাবের ৩ জন সদস্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এদিকে, গত ৩ আগস্ট শহরতলীর নোয়াগাঁও গ্রামে মদ দিয়ে বোনের জামাইকে ফাঁসাতে গিয়ে পুলিশের সোর্স আজিজুর রহমানকে আটক করা হয়। গত মাসের শেষের দিকে সিলেটের গোলাপগঞ্জে প্রতিপক্ষকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসাতে গিয়ে নিজেই ফাঁসলেন সুমন আহমদ সুজা নামের এক মাদক ব্যবসায়ী। এ রকম ঘটনা সিলেটে হরহামেশাই ঘটছে।

মাদক বিক্রির জন্য পরিচিত কাস্টঘর, রেল স্টোশন এলাকা ঘুরে ব্যবসায়ী ও স্থানীয় লোকজনসহ কয়েকজন মাদক বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। মাদক বিক্রেতারা বলছেন, পুলিশের কিছু সদস্য মাদকের সঙ্গে জড়িত। কেউ কেউ মাদক গ্রহণ করছেন, কেউ কেউ সোর্সের মাধ্যমে উদ্ধার হওয়া মাদকদ্রব্যের একটা অংশ আবার বিক্রি করে দিচ্ছেন। কেউ কেউ সরাসরি নিজেরাই মাদক বিক্রিতে জড়িয়ে পড়েছেন এমন অভিযোগে একাধিক পুলিশ হয়েছেন। এছাড়া মানুষকে হয়রাণি করার জন্য পকেটে ইয়াবা গুঁজে দিয়ে মামলা দিচ্ছে বা মামলার হুমকি দিয়ে টাকা আদায় করছে বলে অভিযোগ আছে।

ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অভিযোগ, ক্ষুদ্রাকৃতির এই ‘ট্যাবলেট’ সহজেই মানুষের শরীরের বিভিন্নস্থানে গুঁজে বা কোথাও রেখে যে কাউকে ফাঁসানো যায়। বিশেষ করে রাতে টহল পুলিশ সদস্যদের অনেকে তল্লাশীর নামে শার্ট প্যান্টের পকেটে, গাড়ির ভেতরে বা মোটরসাইকেলের সাইট কভারে ‘ইয়াবা গুঁজে’ লোকজনকে হয়রাণির মাধ্যমে টাকা আদায় করার অভিযোগ ওঠছে হরদম। দাবিকৃত টাকা না পেলে মাদকদ্রব্য আইনে মামলা রুজু করে আদালতে পাঠাচ্ছে। কতিপয় পুলিশের এমন আচরণে উদ্বিঘ্ন ও বিব্রত পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

নগরীর উপশহরের জনৈক বাসিন্দা কয়েক মাস পূর্বে রাত সাড়ে ৮টার দিকে মেন্দিভাগ এলাকা থেকে আটক করা হয়। তখন পুলিশ বলে, ‘তোর পকেটে মাদক আছে’ এ কথাটি বলেই মারধর শুরু করে। পরে তাকে ৩০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ আটক করার কথা জানান শাহপরাণ থানার তৎকালিন এএসআই হেলাল। পুলিশ তার মোবাইল ফোন ও মোটরসাইকেল থানায় জমা না দিয়ে ‘হজমের’ চেষ্টা করে। এরপর মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা হয়। পরদিন আসামীকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে আটকের এ ঘটনার এলাকায় বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।

চলতি বছরের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে সোবহানীঘাটে এক ব্যক্তির পকেটে মাদক ‘ঢুকিয়ে ফাঁসানোর’ চেষ্টার সময় জনতার ধাওয়া খেয়ে পালানোর অভিযোগ রয়েছে কোতোয়ালী পুলিশের এক এসআইয়ের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী দাবি করেন, তিনি কালিঘাট থেকে দোকান বন্ধ করে মহাজনপট্টি-কাস্টঘর হয়ে রিকশা যোগে বাসায় ফিরছিলেন। সোবহানীঘাট এলাকায় আসার পর অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা সিএনজি অটোরিকশার। কাছে কাছে যাওয়া মাত্র দুই পুলিশ সদস্য রিকশার গতিরোধ করে বলে আপনাকে তল্লাশি করতে হবে। এরপর তার পকেটে হাত ঢুকিয়ে বলে, ‘স্যার পকেটে ইয়াবা পাইছি’। এরপর সিএনজি থেকে আরো এক পুলিশ সদস্য এসেই মারধর শুরু করে তাকে। তখন চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসলে অবস্থা বেগতিক দেখে সেখান থেকে পালিয়ে যায় পুলিশ। এ সময় পুলিশ সদস্যদের গায়ে ইউনিফর্ম থাকলেও নাম ছিলো না।

নগরীর বেশ কয়েকটি এলাকায় রাতে কিংবা ভোরে টহল পুলিশ কর্তৃক নিরীহ মানুষকে হয়রানির অভিযোগের শেষ নেই। বিশেষ করে বন্দরবাজার, সোবহানীঘাট, হুমায়ুন রশীদ চত্বর, মীরাবাজার, কাজিরবাজার ব্রিজ, আম্বরখানা, উপশহর, ক্বীনব্রিজ ও বাস টার্মিনালসহ বেশ কয়েকটি এলাকাগুলোতে পুলিশি তল্লাশীর নামে পথচারীদের পকেটে ইয়াবা কিংবা মাদক ঢুকিয়ে হয়রানি অভিযোগটি এখন ওপেন সিক্রেট।

সোর্সদের ইয়াবা বাণিজ্য : সিলেট নগরীতে পুলিশের অন্তত অর্ধশতাধিক সোর্স ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। কোথাও তারা নিজেরা সরাসরি করছে, আবার কোথাও লোক দিয়ে ব্যবসা করাচ্ছে। পুলিশের সঙ্গে সম্পর্ক থাকায় তারা কখনো গ্রেফতার হয় না। এ কারণেই বন্ধ হয় না ইয়াবা বাণিজ্য।

অনুসন্ধানে জানা যায়, নগরীর ৬টি থানার অন্তত শতাধিক স্পটে মাদক ও ইয়াবা ব্যবসা চলছে। এছাড়া আছে মোবাইল সার্ভিসের ইয়াবা সরবরাহকারী গ্রুপ। এসব এলাকায় যারা ব্যবসা করছে তাদের অধিকাংশই পুলিশের সোর্স হিসেবে চিহ্নিত। এসব সোর্স প্রায়ই পুলিশের গাড়িতে চলাফেরা করায় তাদের বিরুদ্ধে মানুষ ভয়ে মুখ খোলে না। তাদের মাদক বাণিজ্য নিয়ে কেউ অভিযোগ তুললে উল্টো অভিযোগকারীকেই নানাভাবে হয়রানি পোহাতে হয়।

মাদক ঘিরে প্রতারণা-বাণিজ্য : সিলেটে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের ঘিরে সংঘবদ্ধ চক্র নানারকম ধান্ধায় মেতে ওঠেছে। মাদক সরবরাহ, পুলিশের ধরা-ছাড়া বাণিজ্য, মাদকবিরোধী সামাজিক কর্মকাণ্ড চালানোসহ নানা কৌশলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রটি। মাদকাসক্তি নিরাময়ের নামেও একটি চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। অথচ ওই সব কেন্দ্রের অধিকাংশের বৈধ কোনো অনুমোদন নেই, নেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও চিকিৎসা সরঞ্জাম।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. নিশারুল আরিফ বলেছেন, পুলিশ জনগণের বন্ধু, আইনের রক্ষক। কেউ এর অপব্যবহার করে বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার চেষ্টা করলে ছাড় পাবে না। পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অপেশাদার আচারণের অভিযোগ পাওয়া গেলে অনুসন্ধান করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

শেয়ার করুন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *